শুক্রবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৮:৫৬ অপরাহ্ন

বিজ্ঞপ্তি:
বিশেষ সতর্কীকরন - "নতুন বাজার পত্রিকায়" প্রকাশিত সকল সংবাদের দায়ভার সম্পুর্ন প্রতিনিধি ও লেখকের। আমরা আমাদের প্রতিনিধি ও লেখকের চিন্তা মতামতের প্রতি সম্পুর্ন শ্রদ্ধাশীল। অনেক সময় প্রকাশিত সংবাদের সাথে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল নাও থাকতে পারে। তাই যেকোনো প্রকাশিত সংবাদের জন্য অত্র পত্রিকা দায়ী নহে। নতুন বাজার পত্রিকা- বাংলাদেশের সমস্ত জেলা, উপজেলা, ক্যাম্পাস ও প্রবাসে প্রতিনিধি নিয়োগ চলছে! বিস্তারিত: ০১৭১২৯০৪৫২৬/০১৯১১১৬১৩৯৩
সংবাদ শিরোনাম :
টরকী বন্দরের ডাকাতির নিউজ করায় সাংবাদিকের উপর হামলা আশুলিয়া থানা যুবলীগের শীর্ষ পদ চায় কে এই রাজু দেওয়ান? রক্তাক্ত ১৫ আগষ্টে ৫ নং ওয়ার্ড আওয়ামীলীগের আলোচনা সভা ও দোয়া অনুষ্ঠান ময়মনসিংহে রওশন এরশাদের পক্ষে নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে জাপার জাতীয় শোক দিবস পালন।। বানারীপাড়ায় জাতীয় শোক দিবস পালন ও হত দরিদ্রদের মাঝে চেক ও খাদ্য সামগ্রী বিতরণ জাপা চেয়ারম্যান জিএম কাদের সাথে বাবুলের সাংগঠনিক বিষয়ে পরামর্শ ও আলোচনা বঙ্গমাতার জন্মদিনে বানারীপাড়ায় সেলাই মেশিন বিতরণ ময়মনসিংহের অষ্টধার ইউনিয়নে গণটিকার উদ্ভোধন করলেন চেয়ারম্যান তারেক হাসান মুক্তা।। তারাকান্দায় এডিসি ও ইউএনও’র গণটিকা কার্যক্রম পরিদর্শন।। সিরাজদিখানে গাজাসহ মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার
রাজশাহীর একমাত্র নারী সংবাদপত্র বিক্রেতা খুকির দায়িত্ব নিলেন জেলা প্রসাশন

রাজশাহীর একমাত্র নারী সংবাদপত্র বিক্রেতা খুকির দায়িত্ব নিলেন জেলা প্রসাশন

মোঃ হায়দার আলী, রাজশাহীঃ সংবাদপত্র বিক্রি করে জীবন কাটাচ্ছেন দীল আফরোজ খুকি। প্রায় ৪০ বছর ধরে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হেঁটে রাজশাহী নগরীর বিভিন্ন এলাকায় সংবাদপত্র বিক্রি করেন তিনি। শহরের একমাত্র নারী সংবাদপত্র বিক্রেতাও তিনি।
কিশোরী বয়সে ৭০ বছরের এক বৃদ্ধের সঙ্গে খুকির বিয়ে হয়েছিল। মাস যেতে না যেতেই স্বামী মারা যান। ১৯৮০ সালে স্বামীর মৃত্যুর পর পরিবার আত্মীয় স্বজন তাকে গৃহ ছাড়া করেন। ভাইদের আপত্তিতে বাবার বাড়িতেো তার জায়গা হয়নি তার। এরপর থেকেই কিছুটা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন তিনি। পাগলী বলে তাকে কেউ আশ্রয়ও দেয় না। এমনকি অনেকে মারধরও করে। তবুও কারো দয়ার পাত্রী না হয়ে বেছে নেন সংবাদপত্র বিক্রির পেশা।
বড় কোনো সমস্যা তাকে কাবু করতে না পারলেও মাঝমধ্যে ছোটখাটো সমস্যাগুলো তাকে অসহায় করে দেয়। এরপরো কোনো লোভ-লালসা নেই খুকির। একদিন মানিব্যাগ ফিরিয়ে দিয়ে মালিকের কাছ থেকে ১৫০ টাকা বকশিস পান খুকি। পুরো রাজশাহীর মানুষকে সেদিন বলেছেন, আমি সবার চেয়ে ধনী। আমার কাছে ১৫০ টাকা আছে। তোমাদের কারো কাছে এতো টাকা আছে?

খুকি জানান, স্থানীয় ও জাতীয় দৈনিকসহ প্রতিদিন ৩০০ পত্রিকা তিনি বিক্রি করেন। এ থেকে প্রতিদিন তার আয় ৩০০ টাকা। এই টাকা থেকে কিছু নিজের খরচ মাত্র ৪০ টাকা। বাকি টাকা থেকে ১০০ টাকা দেন একটি এতিমখানায়, ৫০ টাকা মসজিদ-মন্দিরে, ১০ টাকা ভিক্ষুকদের আর হজে যাওয়ার জন্য ১০০ টাকা একটি ব্যাংকে রাখেন।
প্রতিদিন সকালে তার শিরোইল মহল্লার বাসা থেকে বের হয়ে হেঁটে রাজশাহী মহানগরীর রেলগেট মার্কেটে পত্রিকার এজেন্টদের কাছ থেকে পত্রিকা ক্রয় করেন। তারপর সেখান থেকে হেঁটে হেঁটে রাজশাহীর রেলস্টেশন, শিরোইল বাস টার্মিনাল, সাগরপাড়া, আলুপট্টি, সাহেব বাজার, আরডিএ মার্কেট ও নিউ মার্কেটে পত্রিকা বিক্রি করেন। এইসব স্থানে তার কিছু নিয়মিত কাস্টমার আছে তাদের কাছে পত্রিকা বিক্রি করেন আবার সড়কে চলাচলকৃত বা বাজারে কেনাবেচা করতে আসা মানুষদের কাছে নিয়ে গিয়েও পত্রিকা কিনতে অনুরোধ করেন। এদের মধ্যে অনেকে পত্রিকা নেন আবার অনেকে পত্রিকা নেন না। তবে পত্রিকা বিক্রির বিনিময়ে তিনি কখনো অতিরিক্ত কোনো টাকা পয়সা নেন না।

দিল আফরোজ বলেন, আগে বেশি পত্রিকা বিক্রি হতো। লোকজনের কাছে গেলে পত্রিকা নিতো। এখন কম পত্রিকা বিক্রি হয়। লোকজন তেমন পত্রিকা কিনতে চায় না।’ তারপরও আমৃত্য এই পেশার সাথে থেকেই জীবনের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে চান তিনি। পত্রিকার ক্রয় করার সময় এজেন্টদের সঙ্গে তার লেনদেনও ভালো। টাকাপয়সা কখনো বকেয়া রাখেন না বলে জানালেন পত্রিকার এজেন্টরা। দাম পরিশোধ করেই তিনি পত্রিকা ক্রয় করেন।
রাজশাহীর আরেকটি স্থানীয় দৈনিক সোনালী সংবাদের সার্কুলেশন ম্যানেজার হারুণও জানালেন টাকা পয়সা পরিশোধ করেই তারপর পত্রিকা কিনেন খুকি। তার পত্রিকাও আগে দেড়শো কপির মতো কিনলেও বর্তমানে ৩০ থেকে ৫০ কপির মতো কিনেন বলেন জানান তিনি। রাজশাহী হকার্স শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি জামিউল করিম সুজন জানান, আমি ২০০০ সালে পত্রিকা বিক্রির সাথে যুক্ত হই। তখন থেকেই খুকি আপাকে দেখছি পত্রিকা কিনে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করতে।
একই মহল্লার সত্তরোর্ধ্ব আব্দুল কাদির বলেন, আমার ছোট বোনের বান্ধবী খুকি। বিয়ের পর স্বামী মারা যাবার পর থেকেই সে কিছুটা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। তারপর থেকে তাকে পত্রিকা বিক্রি করতে দেখি। আমিও তার নিয়মিত গ্রাহক। প্রতিদিন সকালে আমাকে পত্রিকা দিয়ে যায়।
খবরের কাগজ বিক্রেতা খুকির যে ভিডিওটি ভাইরাল হয়েছে তা ছিলো ২০০৯ সালের, এরপর কেউ আর তার খোঁজ নেননি। সেই নারী যার নাম “খুকি”। মৃত স্বামী ,বাবা মা, ভাই বোনের অবহেলিত সেই নারী ঘরবাড়ি ছাড়া রাস্তায় পড়ে ছিলো তবুও ভিক্ষের পথ বেছে নেয়নি। সেদিনের মধ্য বয়সী খুকি আজ বৃদ্ধা, এখনও তার হজ্বে যাওয়ার অর্থ জোগাড় শেষ হয়নি। হয়তো কখনও আর শেষও হবে না, তার আগেই ডাক চলে আসবে মহান সৃষ্টিকর্তার। ভিডিওতে তার শেষ কথাগুলো ছিলো,
“কেউ আমাকে এক পয়সার হেল্প করেনি। কি হবে এই সাক্ষাৎকার নিয়ে। কেউ তো আমাকে সাহায্য করবে না।” বিষয়টি নজরে আসে গণমাধ্যমের। বিভিন্ন ইলেকট্রিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় তার সংবাদ প্রকাশ হয়। তার বিষয়ে খোঁজ নেন রাজশাহীর পবা উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভূমি) শেখ এহসান উদ্দীন। গত মঙ্গলবার (১০ নভেম্বর) সকালে তিনি খুকির বাড়ী যান ও খোঁজ খবর নেন। কথা বলেন দিল আফরোজ খুকী সাথে। জানতে পারেন, খুকির তার বাবা ছিলেন, রাজশাহী জেলা আনসার এডজুটেন্ট এবং মা ছিলেন সরকারি হাই স্কুলের শিক্ষিকা। অল্প বয়সে বাবা-মা মারা যায়। এজন্যই তার জীবন সংগ্রামী হয়ে উঠে। তার নিজস্ব বাড়ি আছে। পৈত্রিক ভাবে তারা স্বচ্ছল ছিলেন কিন্তু কিছুটা মানসিক সমস্যা হওয়ায় তার নিজের ভাই বোনও তাকে দেখেনা। বাড়িতে তিনি একাই থাকেন। সকালে বের হয়ে যান পত্রিকা বিক্রি করতে। এরপর সে উপার্জিত টাকায় হোটেলে খান। কয়েক জনকে আর্থিক ভাবে স্বচ্ছল করতে দরিদ্র হিন্দু নারীকে গাভী ও সেলাই মেশিন কিনে দেওয়াসহ বেশ কিছু নারীকে আর্থিক ভাবেও স্বচ্ছল করেছেন খুকি। আর তার সাথে কথা বলে এসব জেনে মুগ্ধ হন ওই সরকারি কর্মকর্তা। তিনি আরো জানতে পারেন, অনেক সময় মানুষ খুকীকে পাগল ভেবে মারধর করে। মাঝে মাঝে খেতে পান না। তাকে দেখাশোনা করার কেউ নেই। এভাবেই চলছে খুকীর জীবন। এসব দেখে তিনি বুঝতে পারেন, খুকীর দেখা শোনা করার জন্য একজন মানুষ প্রয়োজন। তিনি খুকীর পুরো মাসের খাবারের ব্যবস্থা করে দেন এবং পাশাপাশি তার দেখা শোনা করার জন্য একজন মেয়েকে দায়িত্ব দিয়ে আসেন। পরবর্তীতে রাজশাহীর জেলা প্রশাসককে বিষয়টি জানান পবার এসিল্যান্ড শেখ এহসান। জেলা প্রশাসক খুকীর বাড়ি পরিদর্শন শেষে শেখ এহসানকে খুকীর বাসার সার্বিক উন্নয়ন ও খাবার সরবরাহের দায়িত্ব দেন। খুকির বাসা পরিদর্শনকালে জেলা প্রশাসক সাংবাদিকদের বলেন,‘ খুকীর সম্পর্কে জানার পর আমি তাঁর বাসা পরিদর্শন করতে আসছি। তার বাসা অবস্থা ভালো না টিন দিয়ে পানি পড়ে। ডিসি অফিসের পক্ষ থেকে তার বাসার সার্বিক উন্নয়নে ও খাবার সরবরাহের সকল দায়িত্ব এহসানের উপর দেওয়া হল। এহসান সকল দায়িত্ব পালন করবে।’
এ সময় পবা উপজেলার সহকারি কমিশনার (ভূমি) শেখ এহসান সাংবাদিকদের জানান, সামাজিক মাধ্যম ও গণমাধ্যমে দিল আফরোজ খুকীর বিষয়টি আমার হৃদয়ে নাড়া দেয়। আমি বিষয়টি জেলা প্রশাসক স্যারের সাথে আলোচনা করি। স্যার আজকে খুকীর বাসা পরিদর্শন করেন। তার পরামর্শ ও সহযোগিতায় আমি খুকীকে ভালো রাখার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করবো। খুকী আমাকে একটি কথা জানিয়েছে মৃত্যুর আগেই তার বাড়িটি কোন একটা স্কুলের নামে দান করে দিতে চান এবং তার যেন দাফন কুষ্টিয়াতে হয়। তার নাকি জন্মস্থান কুষ্টিয়া। আমি নিয়মিত তার খোঁজখবর রাখবো এবং আমার জায়গা হতে তার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো।

মোঃ হায়দার আলী
রাজশাহী।।

Please Share This Post in Your Social Media






© natunbazar24.net কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Design & Developed BY AMS IT BD